Tuesday, July 27, 2021

কিংবদন্তি পপসম্রাট আজম খান-এর প্রতি সঙ্গীতাঙ্গন এর শ্রদ্ধাঞ্জলী…

– রহমান ফাহমিদা, সহকারী-সম্পাদক।

‘অভিমান’
যখন যাব তোমাদের ছেড়ে পরপারে
রেখোনা তোমরা মনে কভূ মোরে।
চিনলেনা যখন কেউ আমাকে এধরায়
কেন তবে অশ্রু ঝরাবে অঝোর ধারায়।
করো নাকো শোক প্রকাশের শোকসভার
দিও নাকো কখনো মরণোত্তর পুরস্কার।
পুরস্কার তো নয়, সে যেন তিরস্কার!
মনে করিয়ে দিবে প্রয়োজন ছিলনা আমার…

আজকে কিংবদন্তি পপ সম্রাট আজম খানের ১০বছর প্রয়াণ দিবসে আমার এই কবিতাটি লেখার কারণ শ্রদ্ধেয় আজম খান ছিলেন একজন বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা। যদিও সে একাধারে ছিলেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা, ক্রিকেটার ও বিজ্ঞাপনের মডেলও ছিলেন কিন্ত সব কিছুর উর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। অথচ তাঁকে কিনা তিনি মারা যাবার ৮বছর পর সঙ্গীতে মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৯) দেয়া হয়! যা খুবই দুঃখজনক। তাঁরতো একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেঁচে থাকতেই স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার কথা ছিল। এই সঙ্গীতে একুশে পদকতো তিনি বেঁচে থেকেই অর্জন করতে পারতেন! আমি কি ভুল বললাম ? আমি অনেক বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দের কাছ থেকে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে জানতে পেরেছি যে, তাঁদের যেন মারা যাবার পর মরণোত্তর পুরস্কার না দেয়া হয়। একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীতো দুঃখ করে বলেই ফেলেছেন, একবার তো মরেছিই! মরণোত্তর পদক পেয়ে আরেকবার মরতে চাই না।

আজম খান ১৯৬৮ সালে তাঁর বয়স যখন ১৮ বছর, তখন তিনি যোগ দেন গণসংগীত ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র সঙ্গে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। সংগত কারণেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চক্ষুশূল ছিলেন তাঁরা। এ সময়ে নানা রকম বাধা ও হয়রানির শিকার হতে হয় তাঁদের। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে তাদের অত্যাচার-নির্যাতন আজম খানকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, যুদ্ধে যাবেন। মাকে কথাটি বলতেই তাঁর মা তাঁকে বললেন, তাঁর বাবার সাথে কথা বলতে। বাবার কাছে ভয়ে ভয়ে অনুমতি চাইলেন আজম খান। আজম খানের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সরকারি কর্মকর্তা আজম খানের বাবা। আজম খান ভেবে ছিলেন বাবা হয় তো তাঁকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিবেন না। কিন্ত আজম খানকে অবাক করে দিয়ে তাঁর বাবা বললেন, ‘যুদ্ধে যাচ্ছিস যা, দেশ স্বাধীন না করে
ফিরবি না’। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আজম খান! কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে আজম খান বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে প্রথমে গেলেন কুমিল্লা, তারপর সেখান থেকে হেঁটে আগরতলা।
আগরতলা থেকে মেলাঘরে গিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। সেখানে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেষে সম্মুখযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কুমিল্লার সালদায়। সফলভাবে সে অপারেশন সম্পন্ন করার পর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ তাঁকে ঢাকায় গেরিলা অপারেশন পরিচালনার জন্য সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। গুলশান ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাঁরা বেশ কয়েকটি দুঃসাহসি অপারেশন পরিচালনা করে পাকিস্তান বাহিনীর ঘুম হারাম করে দেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘অপারেশন তিতাস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা শহরের কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে দেওয়া। বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, ঐ সকল হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে যে, দেশে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে তিনি তাঁর বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীকালে তাঁর শ্রবণ ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়।
ক্যাম্পে থাকাকালীন আজম খান বাটি আর চামচকে বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে গান করতেন। আর এর মধ্য দিয়ে চাঙ্গা রাখতেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ের এক অংশে লিখেছেন, ‘২০ আগস্ট ১৯৭১। একটি তাঁবুতে আলো জ্বলছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর- ”হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ”। বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা’।

সেই রক্তঝরা উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে গিয়ে বিশিষ্ট নাট্যকার ও মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন ইউসুফ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আজম খান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক জগতে একজন বিস্ময়কর ব্যাক্তি। এই আজম খানের বেড়ে ওঠার সময়ের একজন সাক্ষী আমি। ষাটের দশকে কৈশোর ও যৌবনের আবেগদীপ্ত সময়ে একসঙ্গে কাটিয়েছি আমরা ক’জন ঢাকার বন্ধু। আমাদের ছাত্রজীবন কেটেছে আন্দোলনে-সংগ্রামে। একটি জাতির স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা সবাই জড়িয়ে পড়ি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আজম মেলাঘরে পাহাড়ের পাদদেশে টিনের বাসন ও চামচ দিয়ে তাল ঠুকে গান গাইতেন, সঙ্গে ছিল অনেক তরুণ যোদ্ধা। এ দৃশ্য ভোলার না’। আজম খান তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। এর আগে তাঁরা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে তাঁকে স্যালুট জানাই।

এবার আসি আজম খানের গানের প্রসঙ্গে। আজম খানের কর্মজীবনের শুরু প্রকৃতিপক্ষে ষাটের দশকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে তিনি তাঁর বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড গঠন করেন। তাঁর উচ্চারণ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দ) ভ্রাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকালিস্ট করে অনুষ্ঠান করেছেন। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে সেই অনুষ্ঠানে ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে ও চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচার হলো। ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিল তাঁকে এই দুটি গান। দেশ জুড়ে পরিচিতি পেয়ে গেল তাঁদের দল।
১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেল লাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন। তাঁর পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তীকালে তাঁর মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। এক সাথে কয়েকটি জনপ্রিয় গান করেন তাঁরা। এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসডি-রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবো না’। ‘এক যুগ’ নামে তাঁর প্রথম অডিও এ্যালবাম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় ১৯৮২সালে। ১৭টি একক, ডুয়েট ও মিশ্রসহ সব মিলিয়ে তাঁর গানের এ্যালবাম ২৫টি। তাঁর প্রথম সিডি বের হয় ১৯৯৯ সালের ৩মে ডিস্কো রেকর্ডিংয়ের প্রযোজনায়।
আজম খানের উল্লেখযোগ্য এ্যালবামের মধ্যে আছে ‘দিদি মা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘কেউ নাই আমার’, ‘অনামিকা’, ‘কিছু চাওয়া’, ‘নীল নয়না’ ইত্যাদি। মৃত্যুর পর আগস্ট ১১, ২০১১ সালে ইম্প্রেস অডিও ভিশনের ব্যানারে ‘গুরু তমায় সালাম’ নামে তাঁর সর্বশেষ এ্যালবাম প্রকাশিত হয়।

স্বাধীনতার পরে তাঁকে বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতের বিকাশের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী বেশ কয়েকটি প্রজন্মের শিল্পীদের উপর তাঁর গভীর প্রভাব রয়েছে বলে বলেছিলেন আরেক বিখ্যাত ব্যান্ড শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু (তিনিও আজ আমাদের মাঝে নেই!)। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার তো বটেই, আমার সমসাময়িক এবং আমার আগের একটি প্রজন্ম এবং আমার পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই এখনো যাদের নিজের গান হয়নি, মঞ্চে আজম ভাই-এর গান দিয়েই ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম’। আজম খানের সাদামাটা জীবনধারা নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন। ‘লোভ-লালসার উর্ধ্বে দেখেছি উনাকে। আমাদের প্রতি তিনি সব সময় স্নেহপরায়ণ ছিলেন। তখন যদি আজম ভাই, সালেকা-মালেকা না গাইতেন তবে এখনো হয়তো আমাদের ইংরেজি গানই গাইতে হতো। বাংলা গান আর গাওয়া হতো না’।

সালেকা-মালেকা ও রেল লাইনের বস্তিতে এবং আলাল-দুলালদের মত সাধারণ মানুষদের নিয়ে গান আর আড়ম্বরহীন জীবন তাঁকে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের মনের গভীরে। তাঁকে বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতের একজন অগ্রপথিক বা গুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর গানের বিশেষত্ব ছিল পশ্চিমা ধাঁচের পপগানে দেশজ বিষয়ের সংযোজন ও পরিবেশনার স্বতন্ত্র রীতি।
আজম খান ২০১৯ সালে সঙ্গীত বিভাগে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ পান। ‘কোকাকলা গোল্ড বটল’ ২০০২ সালে আজীবন সম্মাননা পান (হলিউড থেকে ডিস্কো রেকর্ডিং এর সৌজন্যে)। টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার, ২০০২ এবং বেস্ট পপ সিঙ্গার অ্যাওয়ার্ড পান, ১৯৯৩ সালে।
আজম খান ২৮ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মায়ের নাম জোবেদা খাতুন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আফতাবউদ্দিন খান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যাক্তিগতভাবে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক ছিলেন। আজম খানের আরেক ভাই, বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক শ্রদ্ধেয় আলম খান। তাঁর তত্ত্বাবধানে আজম খান প্রথম গান রেকর্ডিং করেন। ১৯৯১-২০০০ সালে আজম খান গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের পক্ষ হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলতেন। তিনি ভালো সাঁতারু ছিলেন এবং নতুন সাঁতারুদেরকেও মোশারফ হোসেন জাতীয় সুইমিংপুলে সপ্তাহে ৬দিন সাঁতার শিখাতেন। ২০০৩ সালে তিনি গডফাদার নামক একটি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেন। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে কাজ করেন।

পপসম্রাট আজম খান দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সাথে লড়াই করে ৫ই জুন, ২০১১তারিখে, রবিবার সকাল ১০টা বেজে ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
আজ পপ সম্রাট আজম খানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর এই প্রয়াণ দিবসে সঙ্গীতাঙ্গন-এর পক্ষ থেকে জানাই অসীম শ্রদ্ধা। তিনি বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে তাঁর অসাধারণ গানের মাঝে।
তিনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। এই দোয়া করি।

Related Articles

Leave a reply

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

18,780FansLike
700SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles