– রহমান ফাহমিদা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময় যে কয়েকজন প্রতিভাবান সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক আধুনিক সঙ্গীতে একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করেন এবং আধুনিক সঙ্গীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করেন, সেই প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতের অসাধারণ প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন শেখ সাদী খান। তাঁকে বাংলাদেশের সুরের যাদুকরও বলা হয়। ১৯৮০ সালে আবদুল্লা আল মামুন পরিচালিত ‘এখনই সময়’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। তিনি অসংখ্য কালজয়ী গানের সুর করেছেন। তাঁর সুর করা গানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ১৯৮৪ সালে আলমগীর কবিরের ‘মহানায়ক’ চলচ্চিত্রে গীতিকার কবি জাহিদুল হক-এর লেখা এবং সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’ গানটির অনবদ্য সৃষ্টিকারী শেখ সাদী খান। এই গানটির জন্য সুবীর নন্দী প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। শেখ সাদী খানের ব্যক্তিগত ঝুলিতে আছে অনেক পুরস্কার। তিনি ১৯৮০ সালে আবদুল্লা আল মামুন পরিচালিত ‘এখনই সময়’ চলচ্চিত্রে সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৬ সালে ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক বিভাগে এবং ২০১০ সালে ‘ভালবাসলেই ঘর বাঁধা যায়না’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সুরকার বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তারপর দীর্ঘ সময়ে ধরে সঙ্গীত জগতে অক্লান্ত পরিশ্রম করার ফলস্বরূপ কাঙ্ক্ষিত একুশে পদকে ভূষিত হন ২০১৮ সালে।
স্বনামধন্য সঙ্গীতপরিচালক ও সুরকার শ্রদ্ধেয় শেখ সাদী খান, ৩ মার্চ ১৯৫০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রামে এক সঙ্গীত সমৃদ্ধশালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সুর সাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর চাচা। তাঁর পিতার হাত ধরে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন তিনি। আজকে ৩ মার্চ ২০২১, এই স্বনামধন্য ও জনপ্রিয় সঙ্গীতপরিচালক ও সুরকার শেখ সাদী খানের জন্মদিন। জন্মদিনটি তিনি কিভাবে কাটালেন, সঙ্গীতাঙ্গন থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন –
জন্মদিনের দিন সকালটা শুরু হয়েছে এভাবে, প্রতিদিন সকালে ধানমন্ডি লেকের ধারে রবীন্দ্রসরণীতে হাঁটতে যাই, আজকেও গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, সঙ্গী সঙ্গিনীরা যারা আমার সাথে হাঁটেন তাঁরা কেক, খাবার বানিয়ে নিয়ে এসেছে। তারপর রবীন্দ্রসরণীতে বসেই কেক কেটে জন্মদিন উৎযাপন করলাম। প্রায় আট\দশজন ছিলাম। সেখানে যদিও কেক কাটাকাটি করলাম তবে তাঁদের আমি বললাম, আমি তো এগুলো করি না। এখন আর এসব ভাল লাগে না! এটা এক সময়, একটা বয়সে ভাল লাগে। আগে তো জন্মদিনের দিন চ্যানেলগুলোতে ডাকতো, কথাবার্তা হত! তবে এবার জন্মদিনে চ্যানেলগুলো ডাকে নাই। সন্ধ্যার সময় বাসায় এসে দেখি আমার মেয়ে, মেয়ের জামাই, গায়িকা রাজিয়া মুন্নি ওরা কেক নিয়ে এসেছে। ওরা আমাকে ডেকে বলে, আপনি এদিকে আসেন। আমি বললাম, এসব বন্ধ কর তো! আমার ভাল লাগে না এসব। আসলে চারিদিকে এত দুঃসংবাদ শুনি! এই একটা বছর মানুষের মৃত্যুর মিছিল চলেছে। কত মানুষ হারিয়ে ফেলেছি! তাই জন্মদিন পালন করতে ভাল লাগে না। তারপর যাই হোক, ওরা ছবিটবি তুলে নিয়ে গেল।
তার আগে স্টুডিওতে গিয়েছিলাম, স্টুডিওতেও একই অবস্থা! তারা বলল, আজকে আপনার জন্মদিন! আমি বললাম, কিছু করার দরকার নাই, আমি কিছু করব না। তোমাদের কাছে আনন্দ লাগে, তোমরা আনন্দ কর। আমাকে আনন্দ দিতে চাও, ভাল কথা কিন্তু আমাকে যখন বল, শুভ জন্মদিন। তখন তো আমার মনে হয়, আমার জীবন থেকে একটা দিন কমে গেল! যাই হোক, এটা এমনেই বলি আর কি। আসলে জন্মদিনের মাধ্যমে আমাদেরকে স্মরণ করা। যদিও আমাদের ইসলাম ধর্মে এসব নাই তারপরেও জন্মদিনের ইস্যুতে সবাই সবাইকে সম্মান জানাই, কেউ যদি ভালবাসে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সবাই মিলে আনন্দ করে আর কি। জন্মদিন পালন করে এটা ঠিক আছে কারণ বাবা মা তাঁর সন্তানদের জন্য স্নেহমমতা থেকে পালন করে। কেউ ভালবাসা থেকে পালন করে। আসলেই সবাই আনন্দ করার জন্যই জন্মদিন পালন করে। আমি একটু আগে এসেছি ফিল্মের সেন্সর বোর্ডের থেকে সিনেমা দেখে। যেহেতু সেন্সর বোর্ডের মেম্বার সেহেতু সিনেমাগুলো দেখতে হয়। এভাবেই কেটেছে সারাদিন।
শ্রদ্ধেয় শেখ সাদী খানের কাছে আজকে তাঁর কত বছর হল জানতে চাওয়া হলে, তিনি তাঁর জন্মদিনের তারিখ খুঁজে বের করার এক মজার ঘটনা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান ইন্ডিয়া হল যখন, ঐ সময়ে আমার জন্ম। আমার সার্টিফিকেটে দুই বছর কমিয়ে দিয়েছি। সম্ভবত আমার জন্ম ৪৮ এর শেষে হবে। আমার জন্ম ফাগুন মাসে বলছে বলে, ১০০ বছরের ক্যালেন্ডার দেখে দেখে খুঁজে বের করেছি যে, মার্চ মাসে আমার জন্মদিন পড়ে। সেই হিসাবে আজকে আরেকটি নতুন বছর যুক্ত হল।
স্বনামধন্য ও জনপ্রিয় সঙ্গীতপরিচালক ও সুরকার শ্রদ্ধেয় শেখ সাদী খান দীর্ঘজীবী হন এবং আরও নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করে শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দিবেন এই কামনা রইল। সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে শুভ জন্মদিনে তাঁর জন্যে শ্রদ্ধা ও অনেক অনেক শুভকামনা।


