ভারতের ‘ভাদু’ গান…

– মোঃ মোশারফ হোসেন মুন্না।

ভাদু গান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি প্রচীন লোকগান। এই গান রাজ্যের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ও বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি ও হাজারিবাগ জেলার লৌকিক উৎসব ভাদু উৎসবে এই গান গাওয়া হয়ে থাকে। কথিত আছে যে পুরুলিয়ার কাশিপুরের পঞ্চকোটের রাজা নীলমনি সিংহদেবের কন্যা ছিলেন ভাদ্রেশ্বরী। সেখান থেকেই ভদ্রেশ্বরী। তা থেকেই ভাদু। লোক মুখে প্রচলিত গল্পটা এমনই কাশীপুরের রাজকন্যা ভদ্রেশ্বরীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু ভদ্রেশ্বরীর বর বিয়ে করতে আসার পথে ডাকাতদের কবলে পরে মরা যান। সেই শোকে ভাদু আত্মঘাতী হন। ভাদুর স্মৃতিকে ধরে রাখতেই কাশিপুরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যবাসী এই ভাদুর শুরু করেন। আবার কেউ বলেন, ভাদ্রমাসে পঞ্চকোট ও ছাতনার রাজার মধ্যে যুদ্ধে পঞ্চকোটের রাজা বিজয়ী হন। সেই স্মৃতিতেই এই গান ও উৎসবের শুরু।

পঞ্চকোট রাজপরিবারের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজদরবারে হারমোনিয়াম, পাখোয়াজ, তবলা, সানাই সহযোগে মার্গধর্মী উচ্চ সাহিত্য গুণ নির্ভর এক ধরণের ভাদু গাওয়া হত হয়। এই পরিবারের ধ্রুবেশ্বরলাল সিংদেও, প্রকৃতীশ্বরলাল সিংদেও এবং রাজেন্দ্রনারায়ণ সিংদেও দরবারী ভাদু নামক এই ঘরানার সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু অন্যান্য সকল ভাদু গীত লৌকিক সঙ্গীত হিসেবেই জনপ্রিয় হয়েছে। লিখিত সাহিত্য না হওয়ায় এই গান লোকমুখেই প্রচারিত হয়ে এসেছে। টুসু ও ঝুমুর গানের বিপরীতে ভাদু গানগুলিতে প্রেম এবং রাজনীতি সর্বোতভাবে বর্জিত। সাধারণত গৃহনারীদের জীবনের কাহিনী এই গানগুলির মূল উপজীব্য। পৌরাণিক ও সামাজিক ভাদু গানগুলি বিভিন্ন পাঁচালির সুরে গীত হয়। সাধারণত রামায়ণ, মহাভারত ও কৃষ্ণ-রাধার প্রেম পৌরাণিক গানগুলির এবং বারোমাস্যার কাহিনী সামাজিক গানগুলির বিষয় হয়ে থাকে। এছাড়া চার লাইনের ছড়া বা চুটকি জাতীয় ভাদু গানগুলিতে সমাজ জীবনের বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র সরস ভঙ্গীতে ফুটিয়ে তোলা হয়। বর্তমানে সামাজিক সচেতনা মূলক প্রচারের জন্য ভাদু গান গাওয়া হয়ে থাকে।

Related Articles

Leave a reply

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles