Sunday, December 4, 2022

তিনি নেই আছে স্মৃতি চিহ্ন…

– শাহরিয়ার খান সাকিব।

আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল
বাতাসের আছে কিছু গন্ধ
রাত্রির গায়ে জ্বলে জোনাকি
তটিনীর বুকে মৃদু ছন্দ…

আকাশের হাতে একরাশ নীল আছে বলেইতো আকাশ নীল। বাতাসে মৃধু গন্ধ আছে বলেইতো ভালোবেসে গায়ে মাখাতে মন চায়। রাতের গায়ে জোনাকি দ্বীপ জ্বালে বলেইতো ভালোবেসে রচিত হয় গান গল্প ছন্দ। তটিনীর বুকে উপচে পড়া ঢেউ যেনো নতুন সুরে বিমহিত করে মানুষকে। গানটি কালজয়ী গানের একটা। বেঁচে থাকবে মানুষের মন থেকে মননে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে চিরদিন। কয়লা যেমন সস্তা জিনিস তার মূল্য হলো মুক্তা হলে। তেমনি মানুষের মুখের কথাও সস্থা জিনিস মূল্য হয় ক্ষেত্র বিশেষে। উপরের কথাগুলো খুবই সাধারণ কথা। কিন্তু তাতে সুর দিয়ে কথাগুলোকে করা হয়েছে অসাধারণ তার উপর কন্ঠে তোলার পর যেনো আরো অসাধারণ হয়েছে। এই গানটি কন্ঠে তুলেছিলেন দেশের এক জনপ্রিয় শিল্পী আন্জুমান আরা।

বাংলাদেশেন স্বর্নালী সময়ের বরেণ্য এক সঙ্গীতশিল্পীর নাম আন্জুমান আরা। কিন্তু আজ তিনি ইতিহাস আর স্মৃতির নাম। তাকে আমরা আজকের দিনে হারিয়েছি। ২০০৪ সালের ২৯শে মে তিনি নিউমনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা আন্জুমান আরা ষোল বছর বয়সেই প্রথম চলচ্চিত্রের গানে নেপথ্যে কন্ঠ দেন। বরেণ্য চিত্র পরিচালক এহতেশাম পরিচালিত উর্দুভাষায় ‘চান্দনী’ চলচ্চিত্রের ‘চান্দনী ভিগি ভিগি হাওয়া’ তাঁর কন্ঠের এ গানটি ওই সময় তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

আন্জুমান আরা- মূলত ষাটের দশকের একজন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। ওই সময় রেডিও, টেলিভিশন, গ্রামোফোন রের্কড ও চলচ্চিত্রে বরেণ্য এ শিল্পীর সতেজ কন্ঠের আওয়াজ শোনা যেতো সর্বত্র। বিশেষ করে রেডিওতে আধুনিক, নজরুলগীতি, লোকগীতি ছাড়াও সেমি-ক্লাসিক্যাল, দেশাত্মবোধক, গজল পরিবেশন করতেন তিনি। নামের বড়াই করো নাকো/ এমন মজা হয়না গায়ে সোনার গয়না/ আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল/ কে মরনের প্রান্তরে/ তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে/ খোকন সোনা/ বৃষ্টি যখন/ সাথী রঙের/ স্বনার্লী ক্ষণ হয়ে আনমন/ মধুর আবেশে ভরা এই ক্ষণ/ ঘুম ঘুম আঁখি দুটি/ কে যেন খুশীর নেশা/ একবার এসো গো সখা/ মাঝ পথে রেখে চলে গেছো/ কার ঐ বাঁশরী বাজে/ আমার এই গান শেষ গান/ এক যে ছিল রাজার কুমার/ ওগো অমন করে আর বেজো না/ মরনরে তোর স্বাদ যে কেমন/ চোখ কি কথা বলে যায় -এ রকম বহু কালজয়ী ভালোবাসার গান গেয়েছেন এই শিল্পী। তাইতো দীর্ঘ এই সময়ে এসেও গানগুলো শ্রোতার মনে নতুন ভাবে দোলা দিয়ে যায়। সঙ্গীতে অবদানের জন্য ২০০২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে গুণীজন পুরষ্কার এবং ২০০৩ সালে শিল্পী আন্জুমান আরা’কে একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া তারকালোক পুরষ্কার ও কলধ্বনি পদকে পান তিনি।
১৯৬৪ সালে টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম গানে কন্ঠ দেন আন্জুমান আরা। রেডিও-টেলিভিশন ছাড়াও অসংখ্য চলচ্চিত্রের গানে কন্ঠ দিয়েছেন গুণী এ শিল্পী। আন্জুমান আরা -১৯৬১ সালে হারানো দিন, ১৯৬২ সালে চান্দা ও জোয়ার এলো, ১৯৬৩ সালে তালাশ ও নাচ ঘর, ১৯৬৪ সালে সুতরাং ও মেঘ ভাঙ্গা রোদ, ১৯৬৫ সালে আখরি ষ্টেশন, ১৯৬৭ সালে অভিশাপ, নয়নতারা, আনোয়ারা ও উলবন, ১৯৬৮ সালে আয়না ও অবশিষ্ট, ১৯৬৯ সালে মলুয়া, ১৯৭০ সালে আপনপর, ১৯৭৪ সালে মাসুদ রানা, ১৯৭৫ সালে বাঁদী থেকে বেগম, ১৯৭৮ সালে অঙ্গার, ১৯৮৪ সালে নতুন পৃথিবী চলচ্চিত্রের বহু গানে কন্ঠ দিয়েছেন। যা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে। তাঁর গাওয়া চলচ্চিত্রের চির-সবুজ অনেক গানই গাইছেন এ প্রজন্মের শিল্পীরাও। উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের রক্তেই যেন মিশে আছে সঙ্গীত। আন্জুমান আরা’র বড় বোন জেবুন্নসা জামাল ছিলেন একজন স্বনামধন্য গীতিকার। আরেক বোন মাহবুব আরা রেডিও-টেলিভিশনের নামকরা সঙ্গীতশিল্পী। সঙ্গীতশিল্পী জিনাত রেহানা তাঁর ভাগ্নি এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী রুনা লায়লা তাঁর আপন চাচাতো বোন। ইংরেজি ১৯৬৪ সাল। বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক প্রথমবারের মতো গানের জন্য কথা সাজালেন। তা-ও আবার বরেণ্য চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত’র পরিচালনায় ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রের জন্য। সৈয়দ শামসুল হক লিখলেন- তুমি আসবে বলে/ কাছে ডাকবে বলে…গানের কথায় সুরারোপ করলেন সত্য সাহা। জনপ্রিয় এই গানটির শিল্পী ছিলেন আন্জুমান আরা। তারপর থেকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হইনি। আজ সেই কিংবদন্তী গায়ীকা আমাদের মাঝে নেই। আল্লাহ তাকে জান্নাত বাসী করুক। সঙ্গীতাঙ্গন এর পক্ষ থেকে তার নাজাতের দোয়া করি।

Related Articles

Leave a reply

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

18,780FansLike
700SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles